insta logo
Loading ...
×

ভূত ধরতে গিয়ে ফাঁদে সাংবাদিক!

ভূত ধরতে গিয়ে ফাঁদে সাংবাদিক!

বিশ্বজিৎ সিং সর্দার ও সম্রাট নাগ, অর্জুনজোড়া(হুড়া):

স্টার্ট নিচ্ছে না বাইক। রাতের অন্ধকার যতটা গভীর, তার চেয়েও গাঢ় অন্ধকার যেন বাইকের ইঞ্জিনে।

কিন্তু কই! কেউ তো জাপটে ধরছে না, দিচ্ছে না আঁচড়ে!

গিয়েছিলাম ভূত ধরতে। হুড়া থানার অর্জুনজোড়া আর কেশরগড়ের মাঝের জঙ্গলে বাইক ধরা ভূতের একটা হেস্তনেস্ত করতে রাত জেগে দেখব পরিস্থিতি, এমনটাই ভেবে রেখেছিলাম। রবিবার রাত জাগবে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ আর যুক্তিবাদী সমিতির সদস্যরা। তার আগেই ভূত খুঁজতে পুরুলিয়া মিরর জাগল রাত। সকালে যতটা হাসি মস্করা ঘিরে রেখেছিল এলাকাকে, ইউটিউবার আর ব্লগারদের দাপটে যে রাস্তা হয়েছিল জমজমাট, সুয্যিমামা পাটে যেতেই পালটে গেল পরিস্থিতি। রাস্তা একেবারে শুনশান। শুক্রবার রাত আটটা নাগাদ একটা বাইক হুসস করে পার হয়ে গেল কেশরগড়কে লক্ষ্য করে। তার স্টার্টও বন্ধ হয়নি।

কিন্তু আমাদের বাইক যে নড়ছে না! টানা সাত মিনিট ধ্বস্তাধস্তি করে স্টার্ট নিলেন তিনি। তেল কম ছিল।

ভূত নেই। আতঙ্ক আছে। আর এই আতঙ্ককে পুঁজি করে বেড়েছে ব্যবসা। মাদুলি বিক্রির রমরমা এলাকায়। ওঝা গুণীণরা বেচছে মাদুলি। রেট একশো টাকা। ‘বাইক ধরা ভূত ধরবে না’ একেবারে গ্যারেন্টি দিয়ে এগিয়ে মাদুলি। কুদলং গ্রামের বাসিন্দা সঞ্জয় মাহাতো বলেন, “এই ভূতের গুজবকে পুঁজি করে ওঝাদের মাদুলি বুজরুকির কারবার চলছে। ভূতের ভয় থেকে বাঁচতে ওঝাদের দেওয়া মাদুলি-কবজ বিক্রি হচ্ছে এন্তার। “

অন্যদিকে বিজ্ঞান মনস্ক সংগঠনগুলির সন্দেহ, রাকাব জঙ্গলের কাঠ পাচার করতে এমন আতঙ্ক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে হয়তো ছড়াচ্ছে গাছ শিকারিরা।
রাকাব জঙ্গলে প্রচুর গাছ। দুষ্প্রাপ্য শ্বেত পলাশের গাছও রয়েছে এই জঙ্গলে। ফলে গাছ পাচারের সন্দেহ উড়িয়ে দিচ্ছে না প্রশাসন।

আর একদিনে তো নয়। কয়েকমাস ধরে গুজব মনের সুখে ডানা মেলেছে।

প্রথম ঘটনা গত বছর পুজোর ছুটির আগে। দ্বাদশ শ্রেণির এক স্কুল ছাত্রী স্কুলে যাওয়ার পথে এক অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়। তার সাইকেল নাকি পেছন থেকে ধরে নেয় কোন অশরীরী! ছাত্রীটি অনুভব করে যে সাইকেলের পেছনে কেউ বসে রয়েছে। ঘটনার কথা পাঁচকান হতে থাকে।

দ্বিতীয় ঘটনা বেশ ধোঁয়াশা পূর্ণ। পঞ্চম শ্রেণীর একটি মূক ও বধির ছাত্র কোন অলৌকিক কিছু ওখানে নাকি দেখেছিল। সে তো কথা বলতে পারে না। ফলে বিশদ কিছু জানা যায়নি। কিন্তু তার কিছু অস্বাভাবিক আচরণ সন্দেহ বাড়ায়।
তৃতীয় ঘটনা তেমন একটা অলৌকিক নয়। এক ক্যান্সার রোগী তার রোগ সারাতে এলাকার একটি শিব মন্দিরে ধরনা দিয়েছিল। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর থেকেই ওই এলাকায় আতঙ্ক বাসা বাঁধে।
চতুর্থ ঘটনা হপ্তা তিনেক আগের। জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয় এক যুবকের দেহ। আতঙ্ক সপ্তমে চড়ে। পঞ্চম ঘটনায়, সপ্তাহ দুয়েক আগে অর্জুনজোড়া গ্রামের বাসিন্দা জলধর গঁরাইয়ের বাইকের স্টার্ট বন্ধ হয়ে যায় ওই এলাকাতেই। পেছন থেকে অশরীরী নাকি জড়িয়ে ধরে তাঁকে। তখনই তার শরীরে আঁচড় দেওয়ার ঘটনা সামনে আসে।

গুজব হাওয়ার চেয়েও দ্রুত ছোটে। এবারও ঘটে ঠিক তেমনটাই। গুজব রটে যায়, ওই রাস্তা পার হতে গেলেই বাইক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে৷ স্টার্ট নিচ্ছে না। আতঙ্কের খবর বৃহস্পতিবার প্রকাশ করে পুরুলিয়া মিরর। সমাজ মাধ্যমে তা ভাইরাল হয়ে যায়। শুক্রবার সকাল থেকে যেন মেলার রূপ নেয় ওই এলাকা।

অর্জুনজোড়ার সেই ভুতুড়ে পথ এদিন সকাল থেকেই ছয়লাপ হয়ে যায় ইউটিউবার আর ব্লগারে। সুদূর মেদিনীপুরের বাসিন্দা পোস্ট অফিসের কর্মী মানিক ভূত দেখতে এসে হতাশ। যে গাছের সামনে প্রথম বাইক থেমে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল, সেই গাছটির একেবারে সামনে গিয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে আসছিলেন আম জনতা।

এলাকার বাসিন্দা যুধিষ্ঠির মাহাতো, কমল মাহাতো বলছেন, “পুরোটাই গুজব। আর এই গুজবের পিছনে থাকতে পারে কোন অসাধু ষড়যন্ত্র। সেই চক্র হয়তো চাইছে, রাস্তা ফাঁকা থাকুক জনগণের মনে আতঙ্ক থাকুক। তবেই হয়তো তাদের কার্যসিদ্ধি হবে।”

শুক্রবার বিকেলে এলাকায় আসে বিজ্ঞানমনস্ক সংগঠন ব্রেক থ্রু সায়েন্স সোসাইটি। তারা বলেন, “হুড়া থানায় গিয়ে জানিয়ে এসেছি, যারা ভূত নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। “

রবিবার পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ ও ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতি এলাকায় রাত জাগবে। উদ্দেশ্য, বেগুনকোদর স্টেশনে ভূতের আতঙ্ক যেমন রাত জেগে দূর করেছিল পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ, ঠিক একই কায়দায় এখানেও করা হবে তেমনই।

হুড়ার বিডিও আরিকূল ইসলাম বলেন, “বিষয়টা আমরা নজরে রেখেছি। পুলিশও বিষয়টা দেখছে। প্রয়োজনে আমি নিজে ওখানে যাবো।”

Post Comment